কীর্তনখোলা রিপোর্ট
দেশের দক্ষিণ উপকূলীয় বিভাগ বরিশাল। এই বিভাগের পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়ায় আছে দেশের অন্যতম বৃহৎ দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। ধুপাড়া, ধানখালী, চর নিশানবাড়িয়া ও নিশানবাড়িয়া-এই চার গ্রামকে ঘিরে পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পটুয়াখালী তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে ওঠে। স্থানীয়দের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়। দীর্ঘদিনের বিদ্যুতের সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে পান তারা। অথচ এই চার গ্রামের মানুষই এখন ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের শিকার। এ যেন বাতির নিচে অন্ধকার হওয়ার মতো অবস্থা। শুধু এই গ্রামগুলোই নয়, বিভাগের ছয়টি জেলা শহর, ৪১টি উপজেলা ও ৪ হাজার ১৬৩টি গ্রামের বাসিন্দারাও দিনে-রাতে একাধিকবার লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ছেন। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকায় মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। শিক্ষার্থীরা স্বাচ্ছন্দ্যে লেখাপড়া করতে পারছে না। ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি নাগরিকদের জীবনে স্থবিরতা নেমে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, লোডশেডিংয়ের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। তীব্র গরমে শিশু ও বৃদ্ধরা রাতে ঘুমাতে পারছে না। হাসপাতালগুলোতে জরুরি চিকিৎসা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রের কাছে থাকা সত্ত্বেও সমন্বয়ের অভাবে এই অঞ্চলের মানুষদের লোডশেডিংয়ের কবলে পড়তে হচ্ছে। অবশ্য বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, জাতীয় গ্রিডের সীমিত সরবরাহ, স্থানীয় ফিডার লাইনে জটিলতা এবং কিছু উৎপাদনকেন্দ্র অস্থায়ীভাবে বন্ধ থাকায় এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া বরিশাল বিভাগের গ্রামীণ ও শহুরে এলাকায় বিদ্যুৎ ব্যবহার হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার নিশানবাড়িয়ার আবুল কালাম মাস্টার বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রের এত কাছাকাছি থেকেও দিনে পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং সহ্য করতে হচ্ছে। তীব্র গরমে রাতের ঘুমও হারাম হয়ে যাচ্ছে। গত সোমবার থেকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।’ কলাপাড়া শহরের বাসিন্দা সাইফ মাহমুদ বলেন, ‘দিনে আট ঘণ্টা ও রাতে ছয় ঘণ্টা লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। তীব্র গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে।’ বিদ্যুৎসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বরিশাল বিভাগের পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পবিস) গ্রামীণ ও উপজেলা এলাকায় প্রায় ২১ লাখ ৬৫ হাজার এবং ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) জেলা শহর ও পৌর এলাকায় প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। ৪২টি উপজেলায় ডে-পিক আওয়ারে ৬৫০ মেগাওয়াট এবং সান্ধ্য পিক আওয়ারে ৮৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ ঘাটতি ৩৫-৪০ শতাংশ। ফলে দিনে-রাতে চার থেকে পাঁচ দফা লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কলাপাড়ার ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, পটুয়াখালী সুপার আলট্রা ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরপিসিএল-নোরিনকো কেন্দ্র, বরিশালের রূপাতলীতে ১১০ মেগাওয়াট সামিট গ্রুপ কেন্দ্র, ভোলার বোরহানউদ্দিনে ২২০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল কেন্দ্র, ভোলার ভেঞ্চার এনার্জি ৩৩ মেগাওয়াট কুইক রেন্টাল কেন্দ্র এবং পটুয়াখালীতে ১৫০ মেগাওয়াট কুইক রেন্টাল কেন্দ্র রয়েছে। এ ছাড়া সামিটের একটি সোলার প্ল্যান্টও বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। পটুয়াখালীর কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রটি ২০২৫ সালের ১৮ জানুয়ারি পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম ইউনিট থেকে ৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু করে। তবে পরে কয়লাসংকট এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের জটিলতার কারণে উৎপাদন স্থগিত হয়। এ ছাড়া পটুয়াখালী ও ভোলার কুইক রেন্টাল কেন্দ্র দুটি বন্ধ রয়েছে। বাকি কেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এদিকে বরিশালের দুটি গ্রিড সাব-স্টেশন থেকে বরিশাল ছাড়াও বিদ্যুৎ যায় ঝালকাঠি, মাদারীপুরের একাংশ ও পিরোজপুরের স্বরূপকাঠিতে। ঝালকাঠি জেলা সদর, নলছিটি ও স্বরূপকাঠিতে বিদ্যুতের চাহিদা ১২ মেগাওয়াট। এই দুটি গ্রিড সাব-স্টেশন থেকে বরিশাল নগরী ও জেলার ৯টি উপজেলাসহ মাদারীপুরের কিছু এলাকায়ও বিদ্যুৎ যায়। এসব উপজেলার বিদ্যুৎ সরবরাহ আবার নিয়ন্ত্রণ করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। এ ছাড়া বাকেরগঞ্জে থাকা গ্রিড সাব-স্টেশনের মাধ্যমে ১৫-২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় ওই উপজেলাসহ আশপাশের কিছু এলাকায়। বরিশালে যে দুটি গ্রিড সাব-স্টেশন রয়েছে, তার মধ্যে রূপাতলী সাব-স্টেশনের আওতাধীন এলাকায় গত রবিবার বেলা ৩টায় বিদ্যুতের মোট চাহিদা ছিল প্রায় ১২০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে তারা পেয়েছে ৮৯ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। একই সময়ে কাশিপুর কলাডেমা সাব-স্টেশন চাহিদার ১৩০ মেগাওয়াটের বিপরীতে পেয়েছে ৬৬ মেগাওয়াট। অর্থাৎ, সরবরাহ কম ছিল মোট প্রায় ৬৪ মেগাওয়াট। এ ক্ষেত্রে নগরাঞ্চলে চাহিদার প্রায় ৭০ ভাগ সরবরাহ করা হলেও গ্রামাঞ্চলে দেওয়া হয়েছে ৫০ ভাগেরও কম। ফলে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় থাকা মানুষকে সইতে হয়েছে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ। বরিশাল নগরীর ব্যবসায়ী জাকির হোসেন বলেন, ‘সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধ করতে হচ্ছে। দিনে ৩-৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে ব্যবসা চালানো অসম্ভব।’ ফজলুল হক অ্যাভিনিউয়ের ব্যবসায়ী আকতার হোসেন বলেন, ‘বিদ্যুৎ চলে গেলে অনেক ব্যবসায়ী এখন জেনারেটর চালান। এই জেনারেটর তেলে চলে। তাহলে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য এই যে লোডশেডিং, তাতে কি লাভ হলো?’ ভাটিখানা এলাকার গৃহবধূ শরমিন আক্তার বলেন, ‘বরিশালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এখনো স্বপ্নের মতো। দিন-রাতে ৪-৫ বার লোডশেডিং হচ্ছে, শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন।’ বরিশাল নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘জ্বালানিসংকটের কথা সবাই জানে। সরকারের উচিত লোডশেডিংয়ের আগাম নোটিশ দিয়ে দেওয়া। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ বন্ধ রাখায় মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে।’ ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি বরিশাল-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুর রহমান বলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছি না। উৎপাদন কেন্দ্রের জটিলতার কারণে সমস্যা হয়েছে। আশা করি দুই-তিন দিনের মধ্যে সমাধান হয়ে যাবে।’