বরগুনা প্রতিনিধি

গভীর বঙ্গোপসাগরে জলদস্যুদের হামলা থামছেই না। সুন্দরবন সংলগ্ন নারিকেলবাড়িয়া এলাকায় মাছ ধরতে গিয়ে পাথরঘাটার দুই জেলে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় উপকূলজুড়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জেলেরা বলছেন, সাগরে নামা মানেই এখন জীবন হাতে নিয়ে যাত্রা। গত ২১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে নারিকেলবাড়িয়া এলাকায় মাছ ধরার সময় একটি ট্রলারে অতর্কিত গুলি চালায় দস্যুরা। এতে নুর আলম খান (৪০) ও শাহজাহান মিয়া (৩৮) গুলিবিদ্ধ হন। আহতদের প্রথমে কলাপাড়া হাসপাতালে নেওয়া হয়, পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ট্রলারটির বিভিন্ন স্থানে গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা হামলার ভয়াবহতা প্রমাণ করে। স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য অনুযায়ী, গভীর সাগর ও সুন্দরবনসংলগ্ন জলসীমায় দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় রয়েছে একাধিক জলদস্যু চক্র। কখনও জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়, কখনও মাছ ও জাল লুট, আবার কখনও সরাসরি গুলি করে আতঙ্ক সৃষ্টি-এভাবেই চলছে তাদের তাণ্ডব। অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না; ক্ষতির আশঙ্কা ও ভবিষ্যৎ প্রতিশোধের ভয়ে অনেক ট্রলার মালিক বিষয়টি এড়িয়ে যান। বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, সাগরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আগের তুলনায় নাজুক হয়ে পড়েছে। জেলেরা নিয়মিত ঝুঁকির মধ্যে মাছ ধরছেন। গভীর সমুদ্রে পর্যাপ্ত টহল না থাকায় দস্যুরা সুযোগ নিচ্ছে। হামলার শিকার ট্রলারগুলোর ক্ষয়ক্ষতি অনেক সময় মালিকদের একার পক্ষে বহন করা সম্ভব হয় না। আহত জেলেদের চিকিৎসা ব্যয় ও পরিবারের দেখভালের বিষয়টিও বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি আরও জানান, দ্রুত ও সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে দস্যু দমন না করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। জেলেদের অভিযোগ, গভীর সমুদ্রে জরুরি সহায়তা পাওয়ার মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। হামলার সময় নিরাপত্তা বাহিনীর তাৎক্ষণিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায় না। ফলে আহতদের উদ্ধার ও চিকিৎসা পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। অনেক ক্ষেত্রে জীবনহানির ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতি মূলত মৎস্যনির্ভর। বরগুনা ও পাথরঘাটার বহু পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি সাগরে মাছ ধরতে যান। প্রতিটি হামলার ঘটনায় শুধু দুই-একজন জেলে নয়, পুরো জনপদ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। দস্যু আতঙ্কে অনেক ট্রলার মাঝেমধ্যে সমুদ্রে যেতে দেরি করে, এতে মাছ ধরার মৌসুমে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়। সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, গভীর সমুদ্রে নিয়মিত ও দৃশ্যমান নিরাপত্তা টহল জোরদার, ট্রলারে আধুনিক নজরদারি ও সংকেত ব্যবস্থা চালু, দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল উদ্ধার ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং দস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় জীবিকার তাগিদে সাগরে যাওয়া উপকূলের তরুণেরা প্রতিনিয়ত মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই পাড়ি জমাতে বাধ্য হবে। বঙ্গোপসাগরকে নিরাপদ রাখতে দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগই পারে এই অনিশ্চয়তা দূর করতে।

বিজ্ঞাপন
Advertisement