পথিক মোস্তফা

দূরপাল্লার বাসের বেপরোয়া গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, স্বল্পগতির ত্রি-হুইলার- অটো, ভ্যান, টমটমের যথেচ্ছা চলাচল ও মাহসড়কের পাশে হাটবাজারের কারণে বরিশাল-ভাঙ্গা মহাসড়কে প্রতিনিয়ত ঝরছে প্রাণ। ঈদকে সামনে রেখে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ না করলে আরো বড়ো ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন যাত্রীসাধারণ। 

বরিশাল-ভাঙ্গা মহাসড়ক, দক্ষিণাঞ্চলের সাথে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে দেশের সর্বদক্ষিণ কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত, পায়রা সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত এই মহাসড়কটি সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও অন্যান্য অর্থনৈতিক যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন এই মহাসড়কে চলছে হাজার হাজার যানবাহন। এই হাজারো দ্রুতগতির দূরপাল্লার যানবাহনের সাথে একই মহাসড়কে অবৈধভাবে চলছে আশপাশের এলাকার স্বল্পগতির অটো ভ্যান, অটোরিকশা, টমটম ও অন্যান্য যানবাহন। তারসাথে বেপরোয়া গতির যন্ত্রদানবখ্যাত তিনচাকার মাহিন্দ্রার মতো গাড়ি মহাসড়ককে আরো বেশি বিপৎসংকুল করে তুলছে। তারোপর, রাস্তার দুইপাশে বর্ধিতকরণের কাজ ও সড়ক ঘেঁষে হাটবাজারের পসরা এক মৃত্যুপুরিতে পরিণত করেছে এই মহাসড়ককে। 

একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বরিশাল-ভাঙ্গা অঞ্চলের ৯২ কিলোমিটার মহাসড়কের প্রশ্বস্ততা মাত্র ২৪ ফুট। যা দূরপাল্লার বাস ও ভারী যানবাহন চলাচলের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। হিসাব মতে, এই মহাসড়কে গড়ে প্রতিবছর ৩শতাধিক মানুষের প্রাণ ঝরে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যার প্রধান কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেনÑ অপ্রশ্বস্ত রাস্তা: বরিশাল থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ৯৭ কিলোমিটার দূরত্বের এই মহাসড়কের বেশিরভাগ অংশই মাত্র ২৪ ফুট প্রশস্ত, যা ভারী যান চলাচলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অবৈধ যানবাহন: মহাসড়কে থ্রি-হুইলার, নসিমন, করিমন ও ব্যাটারিচালিত রিকশার অবাধ চলাচল। বেপরোয়া গতি: দূরপাল্লার বাসের বেপরোয়া গতি ও প্রতিযোগিতার প্রবণতা। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক: মহাসড়কে বেশ কিছু মারাত্মক ও দৃষ্টিহীন বাঁক রয়েছে যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। যত্রতত্র স্পিডবেকার: অনিয়ন্ত্রিত স্পিড বেকারও দ্রুতগতির গাড়ি ও মোটরসাইকেলের দুর্ঘটনার মাত্রা বৃদ্ধি করে। পুলিশের কার্যকরী পদক্ষেপের অভাব: হাইওয়ে পুলিশ বলছে তাদের পর্যাপ্ত লোকবল ও প্রযুক্তির স্বল্পতার জন্য তারা কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণে ব্যর্থ হচ্ছেন। 

এই মহাসড়কে চলাচলকারী প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, দূরপাল্লার বাসের মধ্যে সাকুরা, হানিফ, লাবিবা, শ্যামলীসহ বরিশালের আরো দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসা বাসগুলো বরিশালের গড়িয়ারপাড় পার হলেই তাদের বেপরোয়া গতির তাণ্ডবনৃত্য শুরু করে। বিশেষ করে সাকুরা গাড়ির চালকদের প্রতিযোগিতা ও বেপরোয়া ওভারটেকিংয়ের কারণে পথচারী, মোটরসাইকেল আরোহী ও অন্যান্য ছোটোগাড়ির চালক ও যাত্রীরা অত্যন্ত ভীতসন্ত্রস্ত থাকেন। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, সাকুরার পাশাপাশি এখন হানিফ, লাবিবা, শ্যামলী, বিএমএফ, চেয়ারম্যান, বাউফল সকলেই বেপরোয়া হয়ে উঠছে। শুধু তাই নয়, অখ্যাত গাড়িগুলো যাত্রী ওঠানোর জন্য যেখানে সেখানে যখন-তখন সিগন্যাল ছাড়াই থেমে পড়ে। তাদের সাথে মড়ার ওপর খাড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে তিনচাকার গতিদানব মাহিন্দ্রা। তারা মহাড়কের মাঝখান দিয়ে বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করায়। যার কারণে অহরহ ঘটছে দুর্ঘটনা। 

প্রায়শই বরিশাল থেকে মোটরসাইকেলে গৌরনদী যাতায়াত করেন এমন একজন রাফসান। তিনি জানান, বিগত তিন মাসের মধ্যে বাবুগঞ্জের রাকুদিয়া নতুনহাট থেকে উজিরপুরের জয়শ্রী পর্যন্ত তিনি অন্তত ৬ জনের রক্তাক্ত লাশ পড়ে থাকতে দেখেছেন। এর মধ্যে চলতি মাসের শুরুর দিকে জয়শ্রী এলাকায় পুলিশের চেকপোস্ট কাটিয়ে বেপরোয়া হানিফ গাড়ি পাথচারি দাদি-নাতনিকে রাস্তায় পিষে দেয়। 

এমনকি, এই রিপোর্ট লেখার সময়ও খবর পাওয়া যায় ভাঙ্গা এলাকায় এক পথচারিকে পিষে দিয়ে গেছে বেপরোয়া গতির কোনো দূরপাল্লার বাস।  

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাস্তার বিভিন্ন পয়েন্ট যেমন, রাকুদিয়া নতুন হাট, ইচলাদি টোল এলাকা, আটিপাড়া, বাটাজোড়, গৌরনদী, টরকী, ভূরঘাটা, মোস্তফাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ টিম থাকলেও কার্যত কোনো প্রভাব ফেলছে না, মহাসড়কের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায়। অনেকের অভিযোগ, কিছু কিছু পুলিশ সদস্য কেবল ট্রাক ধরে নিজেদের নির্ধারিত চাঁদা আদায় ও চাঁদা নির্ধারণে ব্যস্ত থাকেন। 

এই সড়কে চলাচলকারী মাহিন্দ্রা চালকরা জানান, তাদের গাড়ির সামনে বিভিন্ন এলাকার স্টিকার লাগানো থাকে। ওই স্টিকার মতে তারা সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক পুলিশকে মাসিক চাঁদা প্রদান করেন। এটাই তাদের রুট পারমিট। পুলিশকে চাঁদা না দিয়ে তারা সড়কে চলাচল করতে পারেন না। ট্রাক ও কভার্ট ভ্যান চালকদেরও একই নিয়ম বলে জানা যায়।

মহাসড়কের আরেক ভয়ানক প্রাণঘাতি খেলায় মেতে ওঠে কিশোর-তরুণ মোটরসাইকেল চালকেরা। জানা যায়, তারা লুকিংগ্লাস খুলে রেখে অত্যন্ত বেপরোয়া গতিতে পেছনে আরো ২/৩জনকে বসিয়ে মোটরসাইকেল চালান। এই সড়কে দীর্ঘদিন মোটরসাইকেল চালানো শাহীন নামের এক চাকরিজীবী জানান, তিনি বিগত ছয়মাসের মধ্যে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো কিশোরদের অত্যন্ত করুণ পরিণতি দেখেছেন। এই সময়ে কমপক্ষে দশ জনের প্রাণহানী ঘটেছে বলে জানান তিনি। তার মধ্যে এই মহাসড়কের পাশে বাটাজোর, মাহিলাড়া, গৌরনদী, ভূরঘাটা এলাকায় দোকানপাট ও হাটবাজার বসায় যে কোনো সময় পূর্বের ন্যায় আবারো বড়ো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। অতিদ্রুত এ সব বাজার অপসারণের দাবি জানান তিনি। 

বাজার অপসারণ ও অন্যান্য সমস্যার বিষয়ে গৌরনদী হাইওয়ে পুলিশের অফিসার ইনচার্জ মোহসিন মোল্লা জানান, অতিদ্রুত তারা এ বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। কোরবানির ঈদ উপলক্ষ্যে তাদের ৩২ কিলোমিটার টহল এলাকার মধ্যে আরো চারটি টিম বাড়ানো হবে বলেও তিনি জানান।  

মাদারিপুর রিজিওনের হাইওয়ে পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম জানান, প্রতিনিয়ত আমরা বিষয়গুলো মনিটরিং করছি। দোষীদের বিরুদ্ধে আমরা শত শত মামলা দিচ্ছি। কিন্তু চালকদের অসাধুতার কারণে কোনো কিছুই কার্যকর হচ্ছে না। মাঝে মাঝে গাড়ির স্পিড ট্রাকিং করা হলেও তারা নির্দিষ্ট স্থানে ক্যামেরা ফাঁকি দিয়ে আবার বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলেও স্বীকার করেন তিনি। এ বিষয়ে, হাইওয়ে পুলিশের লোকবলের অভাব ও প্রযুক্তির অপ্রতুলতাকে আপাতত দায়ী করছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা। তবে বর্তমান সরকারকে এ সব বিষয়ে প্রতিনিয়ত অবহিত করছেন বলেও তিনি দাবি করেন। খুব শীঘ্রই এ সকল সমস্যার সমাধান হবে বলেও আশা করেন তিনি। 

আর এই মহাসড়কে চলাচলকারী যাত্রীসাধারণের আশা, পুলিশ সড়কে নিরব দর্শক ও ক্ষেত্রবিশেষে চাঁদাবাজি না করে সমস্যাসমূহ চিহ্নিত করে দৃশ্যমান কিছু কার্যকরী ভূমিকা পালন করবেন। না হয়, বরিশাল-ভাঙ্গা মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল ধীরে ধীরে বড়ো হতেই থাকবে। আসন্ন ঈদুল আজহায় সড়ককে নিরাপদ করতে দূরপাল্লার বাসগুলোর বেপরোয়া গতি ও বিপজ্জনক ওভারটেকিং বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীর আরো বেশি কঠোর পদক্ষেপ আশা করছেন সচেতনমহল। 


বিজ্ঞাপন
Advertisement