মাহমুদ ইউসুফ

বাংলাদেশি কৃষ্টিক অভিজ্ঞানের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব জহির রায়হান। বাংলাদেশি সংস্কৃতিবোদ্ধাদের শীর্ষচূড়া। কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকর, কথাসাহিত্যিক জহির রায়হান বাংলাদেশের সুবিখ্যাত সাংস্কৃতিক মহিরুহ। তিনি মর্তালোকে বিচরণ না করলেও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে অলঙ্কৃত। জহির রায়হান বাংলাদেশের মহামূল্যবান সম্পদশক্তি বলেই তাঁকে বাঁচতে দেওয়া হয় নাই। তাঁর জীবনব্যাপী কর্ম-উদ্দীপনা কৃষ্টিক সারস্বত চেতনায় ঋদ্ধ। আবহমান কৃষ্টির ক্রমবিকাশে তিনি প্রাতঃস্মরণীয়। ‘জীবন থেকে নেওয়া’ ছায়াছবি তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি। জহির রায়হানের জীবন ও প্রতিভার অবমূল্যায়নের চেষ্টা করা হয়েছে বারবার। কুচক্রিমহল যুদ্ধচলাকালে ধারণকৃত সেলুলয়েড ফিতা ও স্থির চিত্রকে নষ্ট করে দেয়। দেশের শত্রুরা জাতীয় প্রেসক্লাবে তাঁর সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করতে দেয়নি। প্রকাশ প্রচারের পূর্বেই জীবন নাশ ঘটায়। বাংলাদেশি ফ্যাসিবাদ গুরু শেখ মুজিবুর রহমান জহির রায়হানের বোন নাসিমা কবিরকেও জীবনাশের হুমকি দেয়। সমকালীন ঘটনাপ্রবাহে দৃশ্যমান, জহির রায়হান গুমের রহস্য উদঘাটনে সরকারের কোনো উদ্যোগ ছিলো না। একাত্তরোত্তকালে মেজর এম এ জলিলের পর প্রথম গুমের শিকার জহির রায়হান। গত ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী আমলে আমাদের বসবাস ছিলো গুমরাজ্যে। জীবন-মৃত্যুর কোনো ঠিক-ঠিকানা ছিলো না। তবে এই গুম ক্যারিকেচার শুরু হয় মেজর জলিল ও জহির রায়হানের অপরহরণের মধ্য দিয়ে। পরে কবি হুমায়ুন কবির, সিরাজ শিকদারসহ আরও অনেকে। যুদ্ধকালীন যথোচ্চিত্র ক্যামেরাবন্দি করায় ভারতীয় ও লিগি শক্তির চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়ায় জহির রায়হান। জহির রায়হানের কণ্ঠস্বরকে চিরতরে নিস্তব্ধ করে দেয় মুজিববাহিনী। মুজিব বাহিনী তাদের প্রণীত শত্রুতালিকা  মোতাবেক জহির রায়হানের ওপর খড়গহস্ত হয়। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত সাংবাাদিক ও বুদ্ধিজীবী নির্মল সেন জানান: ‘‘সাম্প্রতিককালে জহির রায়হান নিরুদ্দেশ হওয়া নিয়ে নতুন তথ্য শোনা গেছে। বলা হয়েছে- পাকিস্তানি হানাদার বা অবাঙালিরা নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অংশই জহির রায়হানকে খুন করেছে। মুক্তিযোদ্ধাধের এ অংশটির লক্ষ্য ছিল-বাংলাদেশকে স্বাধীন করা এবং সঙ্গে সঙ্গে বামপন্থী বুদ্ধিজীবীসহ সামগ্রিকভাবে বামপন্থী শক্তিকে নিঃশেষ করে দেয়া। এরা নাকি বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের হত্যার একটা তালিকা প্রণয়ন করেছিল। এদের ধারণা এ তালিকাটি জহির রায়হানের হাতে পড়েছিল। জহির রায়হানও জানত তার জীবন নিরাপদ নয়। তবুও সে ছিল ভাইয়ের শোকে মূহ্যমান। তাই শহীদুল্লাহ কায়সারের নাম শুনেই সে ছুটে গিয়েছিল মিরপুরে। তারপর আর ফিরে আসেনি। এ মহলই তাঁকে ডেকে নিয়ে খুন করেছে। তাহলে কোনটি সত্য? জহির রায়হানকে কারা গুম করেছে? পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা, আল বদর, আল শামস, না রাজাকার? নাকি মুক্তিবাহিনীর একটি অংশ? স্পষ্ট করে বললে বলা যায়-মুক্তিবাহিনীর এ অংশটি মুজিববাহিনী। ১৯৭১ সালে প্রবাসী স্বাধীন বাংলা সরকারের অজান্তে গড়ে ওঠা মুজিববাহিনী সম্পর্কে অনেক পরস্পরবিরোধী তথ্য আছে। বিভিন্ন মহল থেকে বারবার বলা হয়েছে, এ বাহিনী গড়ে উঠেছিল ভারতের সামরিক বাহিনীর জেনারেল ওবান-এর নেতৃত্বে।’’ (নির্মল সেন:  আমার জবানবন্দি, পৃ ৪০৬)

চিত্র পরিচালক জহির রায়হান ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে। দেশে ফিরে জহির রায়হান বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ওপর বেসরকারি তদন্ত করে নানারকম প্রমাণ সংগ্রহ করতে থাকেন। ২৫ জানুয়ারি ১৯৭২ তারিখে প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেন: ‘‘বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পেছনের নীলনকশা উদঘাটনসহ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নানা গোপন ঘটনার নথিপত্র, প্রামাণ্য দলিল তার কাছে আছে, যা প্রকাশ করলে সদ্য স্বাধীন  দেশের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই নেওয়া অনেক নেতার কুকীর্তি ফাঁস হয়ে পড়বে।’’ এরপর ২৯ জানুয়ারি ঢাকা প্রেসক্লাবে জহির রায়হান বললেন: ‘‘মুক্তিযুদ্ধের সময় কে কি করছে সব আমি আমার ফিল্মে ধরে রেখেছি। কাল সে ছবি দেখাবো, তখন সব ফাঁস হয়ে যাবে।’’ সেই কাল আর জহির রায়হানের জীবনে আসেনি। (ওবায়দুল হক সরকার: বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনের ইতিহাস, পৃ ৯৪-৯৫)

জহির রায়হানের বড়বোন নাসিমা কবিরকে একদিন ডেকে নিয়ে শেখ মুজিব বললেন: ‘‘জহিরের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে এরকম চিৎকার করলে তুমিও নিখোঁজ হয়ে যাবে।’’ জহির রায়হানের দ্বিতীয় স্ত্রী অভিনেত্রী কোহিনূর আক্তার সুচন্দা এক সাক্ষাৎকারে বলেন: ‘‘জহির আজও ফিরে আসেননি। তার মৃতদেহও আমরা পাইনি। কাউকে কি সন্দেহ হয় সাংবাদিকের এ প্রশ্নে সুচন্দা বলেন, বিষয়টি আড়ালে রয়ে গেছে, আমি জহিরকে মনের অন্তরালেই রাখতে চাই। সব কথা সবসময় বলা যায় না। যে বিপদটা তার জীবনে এসেছিল। তিনি প্রেসক্লাবে দাঁড়িয়ে এক বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘‘যারা এখন বড় বড় কথা বলেন, নিজেদের বড় নেতা মনে করেন, তাদের কীর্তি-কাহিনি, কলকাতায় কে কি করেছিলেন, তার ডকুমেন্ট আমার কাছে রয়েছে। তাদের মুখোশ আমি খুলে দেব।’’ এ কথা বলার পরই তার ওপর বিপদ নেমে আসে। তাঁর বোন বিশিষ্ট নায়িকা ফরিদা আক্তার ববিতা জানান: “যুদ্ধের ৯ মাসে অনেকের কাণ্ডকীর্তি ফাঁস করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন বলেই জহিরকে ফাঁদে ফেলে মিরপুর নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরিকল্পনামাফিক তাঁকে সরিয়ে দেয়া হয় পৃথিবী থেকে। 

সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রায়’ ভারতীয় চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। ১৯৯২ সালে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন শাহরিয়ার কবির। তাদের সংলাপের অংশবিশেষ: সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে সত্যজিৎ রায় শাহরিয়ার কবিরকে হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করলেন: “জহিরের ব্যাপারটা কিছু জেনেছো?” শাহরিয়ার কবির, “তাকে সরিয়ে ফেলার  পেছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আমরা ব্যক্তিগতভাবে তদন্ত করে যা বুঝতে পেরেছি তাতে বলা যায়, ৩০ জানুয়ারি দুর্ঘটনায় তিনি হয়তো মারা যাননি। তারপরও দীর্ঘদিন তাঁকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন। সেটাই ষড়যন্ত্রের মূলসূত্র বলে ধরছি। মিরপুরে দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হলে গভীর ষড়যন্ত্র মনে করার কোনো কারণ ছিল না। আমি যতদূর জানি, বুদ্ধিজীবীদের হত্যার তদন্ত করতে গিয়ে তিনি এমন কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন যা অনেক রথী-মহারথীর জন্যই বিপজ্জনক ছিল, যে জন্য তাকে সরিয়ে ফেলার প্রয়োজন হয়েছিল।” শাহরিয়ার কবিরের মতে, নিখোঁজের পরেও দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে জহির রায়হানকে আটকে রাখার ক্ষমতা ছিল কাদের? নিশ্চয়ই সমকালীন সরকারের। বলা হচ্ছে, বুদ্ধিজীবী হত্যার তদন্ত করতে গিয়ে জহির রায়হানের হাতে এমন কিছু তথ্য এসেছিল যেটা রথী-মহারথীদের জন্য ছিল বিপজ্জনক। স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী সরকারের আমলে কারা ছিলেন রথী-মহারথী? যে ‘বিপজ্জনক’ তথ্যের জন্য তাঁকে সরিয়ে ফেলার প্রয়োজন হয়েছিল সেসব তথ্য কাদের জন্য আতঙ্কের ছিলো? এখানে শাহরিয়ার কবির ও নির্মল সেনের বক্তব্যের অভূতপূর্র্ব মিল। আওয়ামী লীগ ও  মুজিব বাহিনীর হর্তাকর্তারাই ছিলো রথী-মহিরথী!

বাংলার সক্রেটিস খ্যাত জাতীয় বুদ্ধিজীবী ও গবেষক প্রফেসর এবনে গোলাম সামাদ ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন: “চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হানের সঙ্গে আমার কলকাতায় পরিচয় ঘটে। তার থাকবার কোন জায়গা ছিল না প্রথমে। আমি তাঁকে তিন মাসের জন্য থাকবার একটা খুব ভাল ব্যবস্থা করে দিতে পেরেছিলাম কলকাতায়। দেশে ফিরবার পর তিনি মারা যান। তাকে মেরে ফেলা হয়।” ড. সামাদ আরো জানান: ৭ ডিসেম্বর (৭১) কলকাতায় বাংলাদেশ দূতাবাসে একটি উৎসব হয়। রায়হান সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আমিও ছিলাম। তিনি বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব হিসেবে ছিলেন আমার দু’সারি আগে। হঠাৎ তাকে বলতে শুনি, “দেশকে দু’বার স্বাধীন হতে দেখলাম। আবার একবার স্বাধীন হতে দেখবো কিনা জানি না।” কেন তিনি এ ধরনের মন্তব্য করেছিলেন, তা ভেবে আমার মনে পরে অনেক প্রশ্ন জেগেছে। তাঁর মৃত্যু আজো হয়ে আছে রহস্যঘেরা।’’ স্বাধীনচেতা ব্যক্তিত্ব ও স্বাধীনতার কিংবদন্তি চিত্রযোদ্ধা জহির রায়হানকে আওয়ামী লীগ বাঁচতে দেয়নি। উত্তরকালে জিয়াউর রহমান হত্যা, মাহবুব আলী খান হত্যা, সালমান শাহ হত্যা, শরিফ ওসমান হাদি হত্যা একই ধারাবাহিকতা। পিলখানায় সেনা নিধনও তাদের ষড়যন্ত্রের ফসল।

বিজ্ঞাপন
Advertisement