বাংলা সাহিত্যের একাল ও সেকাল সম্পর্কে আলোচনা একটি দুরূহ বিষয়। এই বিষয়টি আপেক্ষিকও বটে। একেক জন আলোচক বা সাহিত্যবোদ্ধা এই বিষয়টি একেক রকম করে আলোচনা করতে পারেন। আর এটি কোনো স্বল্পায়তন আলোচনার বিষয়ও নয়। যাই হোক নাতিদীর্ঘ এই প্রবন্ধে বাংলা সাহিত্যের একাল ও সেকাল নিয়ে কয়েকটি বিষয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করবো।
সব থেকে আগে আমরা জেনে নিই বাংলা সাহিত্যের একাল-সেকাল বলতে আসলে আমরা কী বোঝাতে চাই? মূলত এই প্রবন্ধে সেকাল থেকে একালের বাংলা সাহিত্যের বিষয়, ভাষা, সংস্কৃতি ও পারিপার্শ্বিকতার প্রারম্ভ, প্রবাহ, প্রতিবন্ধ, উৎকর্ষ, অপকর্ষ ও সমৃদ্ধি সম্পর্কে আলোকপাত করার যৎসামান্য চেষ্টা করা হবে।
এবারে আমরা বুঝে নেয়ার চেষ্টা করি— সাহিত্য কী, আর এর আলোচ্য ও ধরন-ধারণই বা কী?: সাহিত্যের সংজ্ঞা: সাহিত্যের আসলে সঠিক কোনো সংজ্ঞা দেয়া যায় না। মানুষের প্রয়োজনে, জীবনের অনুষঙ্গেই সাহিত্যের সৃষ্টি হয়। তারপরও বলা চলে— সাহিত্য শব্দটির উৎপত্তি ‘সহিত+ষ্ণ্য’ থেকে। অর্থাৎ মানুষের জীবনের সাথে যার গভীর সম্পর্ক। সাহিত্য সমাজের দর্পন, সময়ের প্রতিবিম্ব। মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সামাজিক আচার-আচরণ, রাষ্ট্রীয় শোষণ-নিপীড়ন কিংবা সুশাসন, ধর্মান্ধতা বা ধর্মীয় অনুশাসন সবকিছুই ধরা পড়ে সাহিত্যের আয়নায়। শত-শত বছরের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে জীবন্ত দাঁড়িয়ে থাকে সাহিত্য। সাহিত্য হলো মনোজাগতিক সৃষ্টি-সাধনার নাম। কখনো জাগতিক, আবার কখনো জগতের গণ্ডি পেরিয়ে মহাজাগতিক চিন্তা-চেতনা, অনুভূতি যখন লেখকের নিপুণ অভিব্যক্তিতে প্রকাশিত হয় তাই সাহিত্য।
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন এভাবে— ‘সহিত শব্দ হইতে সাহিত্য শব্দের উৎপত্তি। অতএব ধাতুগত অর্থ ধরিলে সাহিত্য শব্দের মধ্যে একটি মিলনের ভাব দেখিতে পাওয়া যায়। সে যে কেবল ভাবে-ভাবে ভাষায়-ভাষায় গ্রন্থে-গ্রন্থে মিলন তাহা নহে; মানুষের সহিত মানুষের, অতীতের সহিত বর্তমানের, দূরের সহিত নিকটের অত্যন্ত অন্তরঙ্গ যোগসাধন সাহিত্য ব্যতীত আর-কিছুর দ্বারাই সম্ভবপর নহে। যে দেশে সাহিত্যের অভাব সে দেশের লোক পরস্পর সজীব বন্ধনে সংযুক্ত নহে; তাহারা বিচ্ছিন্ন। পূর্বপুরুষদের সহিতও তাহাদের জীবন্ত যোগ নাই। কেবল পূর্বাপরপ্রচলিত জড়প্রথাবন্ধনের দ্বারা যে যোগসাধন হয় তাহা যোগ নহে, তাহা বন্ধন মাত্র। সাহিত্যের ধারাবাহিকতা ব্যতীত পূর্বপুরুষদিগের সহিত সচেতন মানসিক যোগ কখনো রক্ষিত হইতে পারে না।’
বিশিষ্ট সাহিত্য সমালোচক আজহার ইসলাম তার সাহিত্যে বাস্তবতা গ্রন্থে বলেন— ‘সাহিত্য বা বাস্তববাদ বলতে সাধারণভাবে জগৎ ও জীবনের যথাযথ রূপের সাহিত্যিক অভিব্যক্তিকে বোঝায়। মহৎ সাহিত্য জীবনাশ্রয়ী সন্দেহ নেই। সে-কারণে জগৎ ও জীবনের নানাবিধ সমস্যা, মানব-জীবনের উত্থান-পতন ও জয়পরাজয়ের কাহিনী যখন সাহিত্যিকের মানসচেতনায় পরম সত্যরূপে ধরা পড়ে এবং তা সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়, তখনই সে প্রয়াস যথার্থ সাহিত্যের মর্যাদা লাভ করে।’
তাইতো আমরা বলতে পারি— সাহিত্য জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়াষয়ের নাম। জীবন যেখানে বহমানতা হারায় সেখানে সাহিত্যধারা রুধিরের ন্যায় প্রবাহিত হয়ে সামাজিক ও রাষ্ট্রিক গতিধারাকে সচল রাখে। সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের সাথে সাহিত্য সরাসরি সম্পৃক্ত না হলেও মানবজীবনের সকল অনুষঙ্গই সাহিত্যের আলোচ্য। সাহিত্য যেমন নিছক খেলাচ্ছলে সৃষ্ট হয় না, কিংবা কারো তোষণ-মনোরঞ্জনও এর বিষয়বস্তু নয়। তারপরও তা পাঠে মানবমনে যে অনুরণন সৃষ্টি করে তা মন থেকে মনের সোপান বেয়ে কাল থেকে কালান্তরের বিষয় হয়ে ওঠে। দেশ-কাল-জাতি-বর্ণ-ধর্মের উর্ধ্বে সাহিত্যের অবস্থান।
আলোচনায় এ বিষয়টিরই ইঙ্গিত বহন করে যে, সাহিত্যের একমাত্র আলোচ্য মানুষ বা মানবতাবাদ। এর বাইরে যখন সাহিত্যিক নামক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কারো মনোরঞ্জন কিংবা ব্যক্তিগত অথবা গোষ্ঠীগত কোনো স্বার্থ হাসিল বা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে চেয়েছে তখনই সাহিত্য তার গতি ও প্রকৃতি হারিয়েছে।
এবারে আমরা এ বিষয়ের আলোকে, মানুষ ও মানবতাবাদকে মানদণ্ড ধরে সাহিত্যের সেকাল-একাল বিচার করতে পারি। বাংলা সাহিত্যের সেকাল-একাল বলতে আমরা এর কালকে মোটা দাগে তিনটি ভাগে ভাগ করতে পারি—
(১) প্রাচীন যুগ: ৬৫০ থেকে ১২০০ খ্রি.; এ যুগ বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ বা বৌদ্ধ সহজিয়াদের সাধনসংগীত রচনার যুগ।
(২) মধ্যযুগ: ১২০১ থেকে ১৮০০ খ্রি.; বাংলায় তুর্কি আগমন থেকে শুরু করে ইংরেজি আধিপত্যবাদের আগ্রাসন পর্যন্ত। এ যুগের নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে: বৈষ্ণব সাহিত্য, অনুবাদ সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান ইত্যাদি। এ যুগটি বাংলা সাহিত্যের সোনালি যুগও বটে।
(৩) আধুনিক যুগ: ১৮০১ থেকে বর্তমান।
এই যুগবিভাগ একেক ভাষাপণ্ডিত একেক ভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। যাই হোক আমরা এখানে মোটা দাগে এই তিনটি বিভাগ নিয়েই আলোচনা করবো।
আগেই আমরা বলেছিলাম যে, সাহিত্য হবে মানুষের জন্য। সাহিত্যের ভাষা, বিষয় ও আলোচ্য সবই মানুষকে ঘিরে রচিত হবে। মানুষের জীবনাচরণ নিয়েই সকল আখ্যান তৈরি হবে। আর তার ব্যত্যয় ঘটলেই সাহিত্য তার লক্ষ্য হারাবে। এই মানদণ্ডে বিচার করে দেখা যাক, কোন যুগের সাহিত্য কতোখানি মানুষঘনিষ্ঠ ছিলো।
প্রাচীন যুগ
প্রাচীন যুগের সাহিত্যিক নির্দশন চর্যাপদ। এর রচনাকাল নিয়ে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, সুকুমার সেন, রাহুল সাংকৃত্যায়ন ও ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের মতো প্রাজ্ঞজনের মধ্যেও মতবিভেদ রয়েছে। তবে সব ছাপিয়ে এ কথা স্বীকার্য যে, চর্যাপদ বৌদ্ধ সহজিয়া বা ধর্মগুরুদের দ্বারা রচিত। এর ভাষাকে বলা হয়েছে আলো-আঁধারির ভাষা বা সান্ধ্য ভাষা। এই ভাষায় বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকগণ তাদের বৌদ্ধ ধর্মের নিগূঢ় তত্ত্ব প্রচার করেছেন বলে সাহিত্যবিশারদগণ মত প্রকাশ করেন। তবে এই আলো-আঁধারির ভাষার রহস্য ভেদ করতে না পারলেও পাঠকদের কোনো আফসোস থাকে না। কারণ এর বয়ানে লিপিবদ্ধ হয়েছে সেকালের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস। সেকালের মানুষের জীবনযাত্রা, জাতপাতের ভেদ-অভেদ সবকিছুরই ইঙ্গিত বহন করে এই চর্যাপদ। চর্যাপদের ভাষার সৌন্দর্য ও মানবীয় দিকসমূহ বিচার করলে একে বাংলা সাহিত্যের একদমই আদি নির্দশন মানতে কষ্ট হয় বলেও কোনো কোনো ভাষাপণ্ডিত মনে করেন। তারা মনে করেন, চর্যাপদের আগেও বাংলা সাহিত্যের কোনো নিদর্শন হয়তো কোথাও আমাদের চোখের আড়ালে রয়ে গেছে। বা হারিয়ে গেছে।
১৯০৭ খ্রি. নেপালের রাজদরবার থেকে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাপদ আবিষ্কার ও ১৯১৬খ্রি. প্রকাশের পর থেকে বাংলা সাহিত্যের নির্দশন ও ঐতিহাসিক কাল কয়েক শতাব্দি পেছনে নিয়ে যায়। যার দ্বারা বাংলা সাহিত্যের গৌরবময় ঐতিহ্য আরো বৃদ্ধি পায়। কিন্তু, এটি নিয়ে নানান টানাপোড়েন শুরু হয়। আদতে চর্যাপদ বাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্যকর্ম কি না, তা নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়। স্বয়ং আবিষ্কারক শাস্ত্রী মহোদয়ও এর ভাষা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যান। তিনি এর ভাষাকে “হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষা” বলে মনে করেছেন। তিনি এর ভাষাকে বলেছেন “সান্ধ্য ভাষা”। যার সংজ্ঞার্থ হলো “... আলো আঁধারি ভাষা, কতক আলোক, কতক অন্ধকার, খানিক বুঝা যায়, খানিক বুঝা যায় না অর্থাৎ এই সকল উচু অঙ্গের ধর্ম্মকথার ভিতরে একটা অন্য ভাবের কথাও আসে” (হরপ্রসাদ, ১৯১৬:৮)।
এর ভাষা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। অসামী, কামরুপী, উড়িশ্যা, পালি, সংস্কৃত অনেক ভাষাপণ্ডিতই একে তাদের ভাষার সম্পদ বলে দাবি করেন। তবে সর্বোপরি, এর ভাষাকে বাংলা ভাষা হিসেবেই স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ চর্যার ভাষা নিয়ে বাংলা ও ইংরেজিতে বহু সংখ্যক প্রবন্ধ রচনা করেন। মূলত সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা (১৩২৭, ১৩৪৮), শনিবারের চিঠি (১৩৫১, ১৩৫৪) ও সাহিত্য পত্রিকায় (১৩৬৪, ১৩৭০)— প্রকাশিত এসব প্রবন্ধে তিনি চর্যাকার-জীবনী ও চর্যার পাঠ-সংশোধনের পাশাপাশি চর্যার ভাষা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেন। পরে একটি দীর্ঘ সম্পূরক প্রবন্ধসহ এই আলোচনার মূল অংশগুলো বাংলা সাহিত্যের কথা, প্রথম খণ্ডের (১৯৫৩) অন্তর্ভুক্ত হয়। এসব নিবন্ধে শহীদুল্লাহ্ দাবি করেন যে, কানুপার চর্যাকে “ভাষাতত্ত্বের দিক থেকে বিচার করলে ... প্রাচীন বাংলা বলতেই হবে”; “শবরীপা যে দুইটি গান লিখেছেন, তা যে প্রাচীন বাংলা ভাষায়, তাতে কোন সন্দেহ নেই”; লুইয়ের গানের অনেক শব্দ “পুরাতন বাংলার”; বিরূপার চর্যায় “প্রাচীন বাংলার লক্ষণ আছে”; ডোম্বীপার চর্যা “পুরানো বাঙ্গালার”; ভুসুকু “প্রাচীন বাঙ্গালা ভাষায় পদ রচনা করেছিলেন”; কুক্কুরী, কম্বলাম্বর, কঙ্কণ, ধর্ম্ম, ভদ্র, বীণা, দারিক, গুণ্ডরী, চাটিল, ঢেণ্টন ও তাড়কের ভাষা “প্রাচীন বাঙ্গালা”। [চর্যাপদের ভাষা বিতর্ক: একটি পর্যালোচনা; ঢাবি পত্রিকা / সংখ্যা-৯৭ / ১৯১৮খ্রি.]
চর্যাপদ আবিষ্কারের এক শতাব্দির বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। নানান গবেষণা ও পঠন-পাঠনের ফলে এর ভাষা ও সাহিত্যসৌন্দর্য আমাদের বাংলা ভাষাভাষিদের অনেকটাই সুবোধ্য ও সুখপাঠ্য হয়ে উঠেছে। তাইতো আমরা বুঝতে পারি যে, এর পদগুলো— কাব্যিক সৌন্দর্য ও ভাষা ব্যবহারে হয়ে উঠেছে অসাধারণ। যেমন এর শুরুতেই রয়েছে মানুষের জৈবিক ও আত্মিক বিষয়ের অবতারণা—
কাআ! তরুবর পঞ্চ-বি ডাল।
চঞ্চল চীএ পইঠো কাল।।
দিঢ় করিঅ মহাসুহ পরিমাণ।
লুই ভণই গুরু পুচ্ছিঅ জাণ।
সকল সমাহিঅ কাহি করিঅই।
সুখ দুখেতে নিচিত মরিআই।।
এড়ি এউ ছান্দক বান্ধ করণক পাটের আস।
সুুনুপাথ ভিড়িও লাহু রে পাস।।
ভণই লুই আম্হে সানে দিঠা।
ধমণ চমণ বেণি পাণ্ডি বইঠাও ।।
পদকার লুইপা বলেন— কায়া বা দেহ তরুর মতো। পাঁচটি তার ডাল। চঞ্চল চিত্তে কাল (মৃত্যু) প্রবেশ করেছে। (চিত্ত) দৃঢ় করে মহাসুখ পরিমাণ কর। লুই বলছেন, (কীভাবে তা করতে হবে ) তা গুরুকে জিজ্ঞাসা করে জেনে নাও । সমস্ত সমাধিতে কী করে ; সুখ দুঃখে সে নিশ্চিত মরে। বাসনার বন্ধন এবং ইন্দ্রিয়ের পরিতৃপ্তির আশা পরিত্যাগ কর, শূন্যতত্ত্ব বিচারের দিকে অগ্রসর হও। লুই বলেছেন, আমি ধ্যানে দেখেছি— ধমণ (পূরক) চমণ (রেচক) দুই পিঁড়িতে (আমি) উপবিষ্ট ।।
ধর্মীয় উপদেশ বাণী হলেও মানবীয় জগত-জীবন ও পারলৌকিক সত্য এখানে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন পদকার লুই পা।
তেমনি এখানে সেকালের সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার ছবিও ফুটে ওঠে। যে-জীবনের কথা এবং ছবি চর্যাপদের বিভিন্ন পদে বিধৃত তাতে বিলাস-ব্যসনাসক্ত, ভোগকামী, ঐশ্বর্যদাদ্ভিক রাজা-উজিরের কথা নেই, আছে সেকালের ছোটোবড়ো সাধারণ লোকের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার ও দৈনন্দিন আচরণের সরল সুন্দর সহজ স্বচ্ছ বর্ণনা। এই কষ্টকল্পনাহীন, আয়াসহীন সাবলীল বর্ণনা অন্যত্র খুঁজে পাওয়া রীতিমত কঠিন। এই বর্ণনা সেকালের সাধারণ লোকের জীবন ও জীবিকা, শ্রম ও বিশ্রাম, কান্না ও আনন্দ, জন্ম-বিবাহ-মৃত্যু, পুজো-আর্চা ক্রিয়াকর্ম, গৃহস্থের পারিবারিক জীবন, দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত খাদ্য ও বাসনপত্র, অপরাধ ও বিচার-পদ্ধতি, সংগীত ও সংগীতের উপকরণ ইত্যাদি বহু বিষয়ের শুদ্ধ শিল্পসম্মত বিবরণ আমরা পেয়ে থাকি ।।
প্রথমে সাধারণ লোকের জীবন ও জীনিকার কথা ধরা যাক। বেশির ভাগ চর্যাগীতিতেই ডোম- ডোমনী, শবর-শবরী, নিষাদ, কাপালিক ইত্যাদির কথা বল! হয়েছে। ডোম নিষাদ শবর ইত্যাদি গ্রামের বাইরে উঁচু জায়গায় বাস করতেন, ব্রাহ্মণরা এদের স্পর্শও করতেন না ।
১। নগর বাহিরে' রে ডোম্বী তোহোরি কুড়িআ!
ছোই ছোই যাইসি ব্রাহ্ম নাড়িআ।
২। টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী।
হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেষী ।।
প্রকৃতি ও লোকজীবনের প্রতিচ্ছবি হিসেবে এখানে অনেক পদের মধ্যে রয়েছে— নৌকা, নদী, আকাশ, পাখি, গুহা, এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান। যা প্রাচীন বাঙালি জীবনের চিত্র তুলে ধরে। বাংলা আদি নিদর্শন চর্যাপদ বিশ্লেষণ করলে আমরা এমন অনেক জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়ের সন্ধান পাই। এর গভীরে প্রবেশ করতে না পারলেও বাহ্য আবরণে যে সৌন্দর্যের প্রলেপ দেয়া রয়েছে তাই কাব্যরসিকদের পিপাসা মিটাতে যথেষ্ট।
সদ্য অপভ্রংশের খোলস ছেড়ে যে বাংলা ভাষা পরিণত হতে যাচ্ছিলো, তাতে সাহিত্য রচনা করে বৌদ্ধ সহজিয়া কবিগণ যে সার্থকতা দেখিয়েছেন তা সত্যিই গর্ব করার মতো। তবে আফসোসের বিষয় হলো, পাল রাজাদের প্রতাপ শেষে যখনই বাঙালিদের শাসন ক্ষমতা সেন রাজারা দখল করলেন তখনই সে বাংলা ভাষা ও তাতে রচিত সাহিত্য পতনের দিকে যেতে শুরু করলো। তাদের ব্রাহ্মণ্যবাদের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বাংলার গৌরব হারিয়ে যেতে বসেছিলো।
মধ্য যুগ
মধ্য যুগের সাহিত্যিক নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে: বৈষ্ণব সাহিত্য, অনুবাদ সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান ইত্যাদি। এ যুগটি বাংলা সাহিত্যের সোনালি যুগও বটে। তবে বিপত্তি বাধে পাল রাজাদের পতনের পর। কারণ, সেন রাজাদের আমলে কোণঠাসা হয়ে পড়া বাংলা সাহিত্য তুর্কিদের আগমনের পর তাদের আনুকূল্যে ও পৃষ্ঠপোষকতায় এক সময় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অবাধ চর্চা শুরু ও বিকাশমান হলেও প্রথম দিকে শত বছরেরও বেশি লেগেছিলো সেন আমলের ক্ষত ঘোচাতে।
পাল রাজাদের পরাস্ত করে বাংলার মসনদে অধিষ্ঠিত হলেন সামন্ত সেন। অতঃপর কমবেশি দেড় শত বছর বঙ্গদেশ জুড়ে চললো সেন রাজত্ব। সেন রাজারা ছিলেন উগ্র ব্রাহ্মণ্যবাদী। তাদের উগ্র ব্রাহ্মণ্যবোধের আগুনে আরও অনেক কিছুর সঙ্গে দগ্ধ হলো কৈশোরের প্রথম ধাপে পা রাখা বাংলা ভাষাও। সেন রাজত্বকালে একদিকে যেমন রাজসভা থেকে বাংলা ভাষাকে সম্পূর্ণভাবে বহিষ্কার করা হলো অন্যদিকে তেমনি সামাজিক ক্ষেত্রে সেদিন যারা আলাদা করে লেখালিখি সহ অন্য কোনো ভাবে বাংলা ভাষাকে ধারণ ও লালন করার চেষ্টা করছিলেন তাদেরকে ব্রাত্য করে দেওয়া হলো পুরোপুরি। এতে অত্যন্ত বিপন্ন হলো নবজাত বাংলা ভাষা।
পরবর্তীতে তুর্কি শাসকরা একদিকে যেমন সমাদর করে বাংলা ভাষাকে রাজসভায় স্থান করে দেন, অন্যদিকে তেমনি তাদের কারণে আরও অনেকভাবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশের পথ সুগম হয়। তাদের সময়ই কবীন্দ্র পরমেশ্বর, শ্রীকর নন্দী, কৃত্তিবাস ওঝার মতো কবিরা সরাসরি রাজসভার পৃষ্ঠপোষকতা পান। গৌড়ীয় রাজন্যবর্গের দেখাদেখি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করতে উদ্যোগী হন অনেক আঞ্চলিক রাজারাও। তাদের রাজসভায় স্থান পান মুকুন্দ চক্রবর্তী, রামেশ্বর ভট্টাচার্যসহ আরও অনেকেই। বাংলা ভাষায় কাব্য রচনাকারী কবিরা রাজ অন্নে প্রতিপালিত হচ্ছেন, ভূষিত হচ্ছেন রাজসম্মানে; এর সামাজিক ফলশ্রুতি কতটা সুদূর প্রসারী হতে পারে তা বলা বাহুল্য। জনমানসে অতঃপর বাংলা ভাষার কদর বহুগুণ বেড়ে যায়।
এ তো গেল একদিক। এর অন্যদিকটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের যে পাঁচটি প্রধান ধারা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে রেখেছে— অনুবাদ সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণবসাহিত্য, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান ও ইসলামি সাহিত্য তার সবের মূলে রয়েছে তুর্কি শাসন; অন্য অর্থে ইসলামিক সংস্কৃতির প্রত্যক্ষ প্রভাব। তবে কোনো ভাবেই সেন রাজাদের ঘোরতর ব্রাহ্মণ্যবাদের মতো প্রতিঘাত নয়। প্রাক্ তুর্কি শাসন পর্বে বাংলা ভাষায় ধর্মীয়গ্রন্থ অনুবাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিলো শাস্ত্রকারদের প্রবল নিষেধবাণী— ‘অষ্টাদশ পুরাণাণি রামস্য চরিতানি চ/ ভাষায়াং মানবঃ শ্রুত্বা রৌরবৎ নরকৎ ব্রজেৎ।’ অর্থাৎ যে ব্যক্তি দেশীয় ভাষায় বেদ, পুরাণসহ কোনো শাস্ত্রগ্রন্থের অনুবাদ করবে সে সবংশে নরকে যাবে। এমন ভয়ঙ্কর নিষেধবাণী উপেক্ষা করে সেদিন অনুবাদ সাহিত্য রচনা অসম্ভব ছিলো যদি না তুর্কি আগমন ঘটতো। তুর্কি শাসকরা একদিকে যেমন তাদের কবি-সাহিত্যিকদের অনুবাদ কাব্য রচনায় প্রত্যক্ষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলেন, অন্যদিকে তেমনি তুর্কি শাসন প্রতিষ্ঠার সূত্রে শিথিল হয়েছিল ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির সামাজিক বাঁধন। তখন আর সবংশে নরকবাসী হওয়ার ভয়ে তাদের কলমকে সংযত করতে আগ্রহী ছিলেন না বাংলার কবিসমাজ। অনুবাদ সাহিত্যের মতো মঙ্গলকাব্য রচনার নেপথ্যেও ছিল তুর্কি শাসনের প্রত্যক্ষ প্রভাব। উচ্চ ও নিম্নবর্ণীয় হিন্দু সমাজের মধ্যে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা মঙ্গলকাব্যের মূল ভিত্তি। এই সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করতেই হতো না যদি না তুর্কি শাসন প্রতিষ্ঠা হতো।
এর পাশাপাশি এ সময়, মুসলমান সমাজও বাংলা ভাষাচর্চার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নেয়। বড়ু চণ্ডীদাসের অব্যবহিত পরেই সাহিত্যক্ষেত্রে পদার্পণ করেন কবি শাহ মুহম্মদ সগীর। তার কলমের স্পর্শে প্রণীত হয় আস্ত একটি কাব্য ইউসুফ জোলেখা। সেই শুরু। অতঃপর পরবর্তী চার শতক জুড়ে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে মুসলমান সমাজের সোচ্চার পদচারণা অব্যাহত থাকে। রচিত হয় বাহরাম খানের লায়লী মজনু, মুহম্মদ কবিরের মধুমালতী, আবদুল হাকিমের লালমতী সয়ফুলমুলুক, দোনাগাজীর সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল, দৌলৎ কাজীর লোরচন্দ্রাণী সতীময়না, আলাওলের পদ্মাবতী, সৈয়দ সুলতানের নবীবংশ, জয়নুদ্দিনের রসুল বিজয় প্রভৃতি অসংখ্য কাব্য। উল্লেখ্য মুসলমান কবিদের বাংলা ভাষায় এই যে কাব্যচর্চা সেখানে ছিল না কোনো দ্বিধা, কোনো পিছু টান; নিজেদের দিক থেকে একশো শতাংশ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তারা।
আধুনিক যুগ
এ যুগকে নিয়ে একটি আলাদা গ্রন্থের দাবি রাখে। আমি বলবো, তথাকথিত আধুনিকতা শুরুর যুগ। কোনো কোনো সাহিত্য ও ভাষাপণ্ডিত ১৮০১ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও গদ্য রচনার সময়কাল থেকে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ গণ্য করেন। তাদের মতে এ সময় থেকেই নাকি মানবিক সাহিত্য রচনা শুরু হয়। এসময় থেকে বাংলা সাহিত্যে নিছক ধর্মকে বাদ দিয়ে মানুষের অনুপ্রবেশ শুরু করে। সে বিষয়টি বর্তমান সময়ে এসে আরো বেশি আলোচনার দাবি রাখে। কারণ, আমরা আলোচনা করার চেষ্টা করেছি যে, প্রাচীন নির্দশন চর্যাপদেও কতোখানি মানবিক বিষয়াদি নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। আলোচনার কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায় এড়িয়ে গিয়েছি মধ্য যুগের সাহিত্যের বিষয়-আশয় কতোটা মানবিক ছিলো, তা। কিন্তু আলোকপাত করলে আমরা দেখতে পেতাম কতোকটা ধর্মীয় অনুষঙ্গের প্রাবল্য থাকলেও গোটা সাহিত্য জুড়ে বিশেষ করে অনুবাদ ও রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানগুলো ছিলো বর্তমান সাহিত্যের অনেকের থেকেই মূল্যবান ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন। যেমন- সেকালের লাইলী মজনু, শিরি ফরহাদ, পদ্মাবতীর সমতুল্য একটি কাহিনিকাব্য বর্তমান সময়ও খুঁজে পাওয়া ভার। মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গলের কালকেতু উপাখ্যান, ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের অন্নদা মঙ্গলের বিষয়াবলি কোনো অংশেই অনাধুনিক কিবা মনুষ্য বিবর্জিত সাহিত্যিক নিদর্শন নয়। এ সবের প্রধান কারণ হলো— সে কালের কবিগণ মুসলিম শাসনামলে স্বাধীনভাবে এমনকি রাজপৃষ্ঠপোষকতায় তাদের কাব্যচর্চা করতেন।
কিন্তু আমাদের তথাকথিক আধুনিক সাহিত্যের শুরুই হয়েছিলো আধিপত্যবাদ দিয়ে। ১৭৫৭ সালে বাংলার নবাবকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পরাজিত করে ইংরেজদের বাংলা দখলের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আরেকদফা ইংরেজবাদ ও ব্রাহ্মণ্যবাদের যাঁতাকল। বাংলা ভাষাকে মুসলমান ও নিম্নবর্ণের বাঙালি কবিদের হাত থেকে কেড়ে নেয়ার আসল ষড়যন্ত্রের শুরু এখান থেকেই। এবারে আর সেন আমলের রাজাদের মতো করে নয়। এবারে ব্রিটিশদের কুটকৌশলের সাথে যুক্ত হলো আগেকার কৌলিন্য। তাদের আরেকদফা নিপীড়নের মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে হত্যা করা হলো। নিজস্ব সত্তা নিয়ে বেড়ে ওঠা বাংলা ভাষাকে সংস্কৃত নামক মৃতপ্রায় ও জনবিচ্ছিন্ন ভাষার নিগড়ে আবদ্ধ করে হত্যাচেষ্টা করা হলো। ওদিকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্বাভাবিক বাংলার ধারাকে আরো বেশি বেড়ি পরানো হলো।
বর্তমান সময়ের সাহিত্যবোদ্ধাগণ মনে করেন— বাংলা সাহিত্যে সংস্কৃতের আগ্রাসন মূলত ঔপনিবেশিক শাসনামলে (বিশেষত ব্রিটিশ আমলে) সংস্কৃতকেন্দ্রিক একটি তথাকথিত শুদ্ধ বাংলা ভাষা ও সাহিত্য তৈরির প্রচেষ্টা, যেখানে ফারসি ও আরবি শব্দ বর্জন করে বাংলাকে ‘বিশুদ্ধ আর্য ভাষা’ ও সংস্কৃতির ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছিলো, যা ছিলো ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারের একটি কৌশল। এই প্রক্রিয়ায় বাংলা ভাষার নিজস্বতা ক্ষুণ্ন করে তাকে সংস্কৃতের সঙ্গে মিশিয়ে দেয়ার প্রবণতা দেখা যায়। যার ফলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির নিজস্ব লোকায়ত ধারাকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে বলেই অনেকে মনে করেন।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যেরে প্রতি সংস্কৃত আগ্রাসন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নীতি ছিলো— ইংরেজ শাসকরা হিন্দু-মুসলিম বিভেদ তৈরি করতে এবং শাসনকে সুগম করতে সংস্কৃতকে কেন্দ্র করে একটি ‘বিশুদ্ধ’ বাংলা ভাষা গঠনের ধারণা প্রচার করে, যা ছিল একটি রাজনৈতিক অপকৌশল। বাংলা ভাষাকে আরবি-ফারসি মুক্ত করে ‘আর্য’ ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়, যা বাংলা সাহিত্যকে সংস্কৃতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করে।
বিশ্লেষকগণ মনে করেন, সংস্কৃতকেন্দ্রিক পণ্ডিত সম্প্রদায় বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও ব্যাকরণকে সংস্কৃতের আদলে ঢেলে সাজাতে চেয়েছিলেন, যা বাংলাকে ধর্মের বিপরীত বা ‘মুসলমানদের ভাষা’ হিসেবে দেখার প্রচলিত ধারণার প্রতিক্রিয়াও ছিলো। এ বিষয়টিও ইংরেজরা হিন্দু-মুসলিমদের মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি করে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহার করেছিলেন বলেই মনে করেন তারা। এই প্রক্রিয়ায় বাংলা ভাষায় প্রচুর সংস্কৃত শব্দ ও অলঙ্কার যুক্ত হয়েছে, যা ভাষাকে সাহিত্যের দিক থেকে খানিক সমৃদ্ধ করেছে। তবে এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে বাংলা তার নিজস্বতা হারিয়ে ফেলে এবং সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা থেকে দূরে সরে যায়। যার ঘানি এখনও আমরা টানছি। যার ফলে এখনও আমাদেরকে বাংলা ও তৎসম বা সংস্কৃত নামে আলাদা ব্যাকরণিক রীতিনীতি শিখতে হচ্ছে। বর্ণমালায়ও ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে বিভ্রান্তি, যার ফলে সাধারণের মধ্যে বানানভীতি তৈরি করছে। তথাকথিত শুদ্ধ তথা সংস্কৃত প্রভাবিত বাংলা বনাম ফারসি-আরবি মিশ্রিত ‘মিশ্র’ বাংলার মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, যা বাংলা সাহিত্যের গতিপথকে প্রভাবিত করে। ভাষাগত এই আগ্রাসন ছিলো সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদেরই অংশ, যেখানে একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক ধারাকে বাংলার ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়।
এই আগ্রাসন একদিনে ঘটেনি, বরং ঔপনিবেশিক শাসন ও তার পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে এর প্রভাব বিস্তার লাভ করে। সংস্কৃতের এই প্রভাব বাংলা সাহিত্যের নিজস্বতাকে প্রশ্ন তুলেছে, যা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আর তথাকথিত আধুনিককালে এসে বাংলা সাহিত্যের গতিপথকে করেছে আবদ্ধ। আর এর ফলে হিন্দু ও মুসলিম সাহিত্যের রেখাবিভেদ তৈরি হয়েছে। যা আরবি-ফারসি সাহিত্যের প্রভাবে মোটেও হয়নি। কারণ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, প্রমথ চৌধুরীর মতো প্রতিভাবান কবি-সাহিত্যিকগণও অনায়াসে এই ভাষা ও শব্দ ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে, কাজী নজরুল ইসলাম প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করে এ শব্দকে বাংলাভাষার সম্পদ করে তুলেছেন, কোনোভাবেই ভারিক্কি করেননি বা কোনো নিয়মকানুনের নিগড়েও বন্দি করেননি। কিন্তু, সংস্কৃতকে বাংলার গুরু বানাতে গিয়ে উনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে বড়ো বড়ো সাহিত্য সাগর কিংবা সম্রাটেরা বাংলা ভাষাকে সাহিত্যের ভাষা থেকে কেড়ে নিয়েছেন, সরিয়ে দিয়েছেন মানুষের জীবন থেকেও।
যাই হোক, ১৯৪৭-এর দেশবিভাগের পর বাংলা সাহিত্য সংস্কৃত ভাষার আগ্রাসন থেকে কিছুটা মুক্ত হলেও এখানে এসে সে আবার পাকিস্তানিদের খপ্পড়ে পড়ে যায়। আবার শুরু হয় উর্দুর নিপীড়ন। এখানে এসে রবীন্দ্রসাহিত্য হারাম হয়, নজরুল কাফির হন নানা রকম ফেরকায় পড়ে আবারো বাংলা সাহিত্য তার নিজস্বতা হারাতে বসে। সেখানেও এতোদিনের ব্রাহ্মণ্যবাদ মুক্ত হওয়ার আনন্দে কেউ কেউ বাংলাকে আবার হিন্দুয়ানি ভাষা ও সাহিত্য ভাবতে শুরু করে আরেক ধাপ একে পিছিয়ে দেয়। যাই হোক, এ ধারায় বাংলাদেশের নিজস্ব বলয় তৈরি হয়। সৃষ্টি হন, মীর মশাররফ হোসেন, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী, গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমেদ, জীবনানন্দ দাশ, জসীমউদ্দিন, আহসান হাবীবের মতো অনেক জনমানুষের কবি-সাহিত্যিক।
১৯৭১ সাল। বাংলার সবচেয়ে বাঁক ফেরানো সময়। স্বাধীনতা লাভ করা বাংলায় তৈরি হয় একদম নিজস্ব ঘরানার বিশ্বমানের কবি। এ যুগে সকল নাগপাশ ধীরে ধীরে ছিন্ন করার মতো প্রতিবাদী ও শক্তিশালী কবি-সাহিত্যগণের আবির্ভাব হয়। সাহিত্যের বিষয় হয়ে ওঠে আরো অধিকতর জীবনমুখী। মাঠের মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি কলমেও চলে প্রতিবাদ। মুক্তির ভাষা হয়ে ওঠে— কবিতা-গল্প-উপন্যাস-গান। সাহিত্যিকের ভাষা হয় শাণিত। কবি নজরুল ইসলামের মতো প্রতিবাদী ভাষাও তৈরির চেষ্টা করেন সমকালীন কবি-সাহিত্যিকগণ। সাহিত্যে উঠে আসে, ভাষা আন্দোলন, অসহযোগ ও স্বাধীনতা যুদ্ধ। উঠে আসেন, সৈয়দ আলী আহসান, কবি শামসুর রাহমান, আল-মাহমুদ, শহীদ কাদরী, আবুল হাসান, আবিদ আজাদ, হেলাল হাফিজ, মাহবুবুল হক, সুফিয়া কামাল, সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ুন আহমেদের মতো কবি-সাহিত্যিক। এ ধারারও ব্যাপক আলোচনা প্রয়োজন, যা স্বল্পায়তন প্রবন্ধের বিষয় নয়।
এরপর এলো প্রবল আলোড়ন তোলা বিংশ শতকের শেষ থেকে একবিংশ। পাল্টে গেলো যুগের ভাষা, তৈরি হলো এক অন্য রকম উত্তরাধুনিকতা। যাদের ভাষা ও শব্দে এলো দারুণ পরিবর্তন। আশির দশক, নব্বই দশক ও প্রথম দশক থেকে প্রবল তোড়ে বাংলা সাহিত্য এক নতুন রূপ লাভ করতে শুরু করলো। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু সকল দ্রোহের ভাষা হয়ে উঠলো কবিতা ও অন্যান্য সাহিত্য। সব শেষে এলো ২০২৪ সালের বাঁক বদলের বাংলা সাহিত্য। ৩৬ জুলাইয়ের মাত্র ৩৬ দিনের ফ্যাসিস্ট পতনের আন্দোলনে বাংলা সাহিত্যে তৈরি হলো জেনজেড এর ভাষা। সে কী দ্রোহ, কী তেজ— সব মিলিয়ে তৈরি হলো বাংলা সাহিত্যের অন্য রকম এক যুগ। কবিতার ভাষা থেকে শুরু করে দেয়ালের গ্রাফিতির ভাষাও পেলো আরেক সাহিত্যিক মর্যাদা। আশান্বিত হলো, বাংলা সাহিত্য। মনে হচ্ছে, কোনো আধিপত্যবাদ, কোনো আগ্রাসনই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে আগলে বন্দি করতে পারবে না।