পথিক মোস্তফা
নিজের প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার যথাযোগ্য মর্যাদা পেলেন বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সংসদ সদস্য জহিরউদ্দিন স্বপন। দারুণ প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে রাজনীতি করে জনগণের নিরঙ্কুশ সমর্থন নিয়ে ৩য় বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে পেয়ে গেলেন মন্ত্রীত্ব। সর্বশেষ সুনীল গুপ্তের মন্ত্রীত্বের পর গৌরনদী-আগৈলঝাড়াবাসীর এ এক বড়ো ধরনের অর্জন বলে জানান, এলাকাবাসী।
জহিরউদ্দিন স্বপন, শুধু বরিশালের রাজনীতিতে নয়, বাংলাদেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে এক ব্যতীক্রমী নাম। ১৯৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ছাত্রনেতা হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেন। সেই সময়ই তার রাজনৈতিক দক্ষতার পরিচয় ফুটে ওঠে। এরপর তিনি ১৯৯১ সালে গৌরনদী-আগৈলঝাড়া আসনে বাম দলের থেকে নির্বাচন করে মাত্র ৬১৩ ভোট পেয়েছিলেন। তখন এ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক কাজী গোলাম মাহবুব, তিনি পরাজিত হয়েছিলেন আওয়ামীলীগের আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর কাছে। আবুল হাসানাত ভোট পেয়েছিলেন ৫৫ হাজার ৬৯৭টি ও কাজী গোলাম মাহবুব পেয়েছিলেন ৪৬ হাজার ৮৫৫টি। এই নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলেও এই আসনটি থাকে আওয়ামীলীগের দখলে। এই আসনটিকে ধরা হতো আওয়ামীলীগের দূর্গ। হিন্দু প্রধান এলাকা আগৈলঝাড়ার কারণে এই আসনে সব সময় এগিয়ে থাকতো তারা। ১৯৯৩ সালে বাম দল ছেড়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদি দল বিএনপিতে যোগ দেন জহিরউদ্দিন স্বপন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হিসেবে তার যোগ্যতা ও প্রজ্ঞার কারণে তিনি যুক্ত হয়ে যান বিএনপির কেন্দ্রিয় রাজনীতির সাথে।
এরপর জহির উদ্দিন স্বপনের বিএনপির সাথে পথচলা। সাংবিধানিক নিয়ম রক্ষা ও তত্ত্ববধায়ক সরকারের আইন পাস করার জন্য ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন দেন বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। সেই নির্বাচনে জহির উদ্দিন স্বপনকে বিএনপি থেকে মনোয়ন দেয়া হয়। তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দলে যোগদানের মাত্র ৩ বছরের মাথায় দলীয় মনোনয়নের জন্য বিবেচিত হওয়াও ছিলো তার রাজনৈতিক মেধার মূল্যায়ন। ১৫ ফেব্রুয়ারির এ নির্বাচনের সংসদ মাত্র ১২ দিন স্থায়ী হয়েছিলো। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস করেই সেই সংসদ ভেঙে দেয়া হয়েছিলো। পরবর্তীতে একই বছর ১২ জুন আবারো নির্বাচন হয়, সেই নির্বাচনে আবারো কাজী গোলাম মাহবুবকে মনোনয়ন দিলে তিনি আবারো আওয়ামীলীগের আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর কাছে হেরে যান। তখন তাদের ভোট ছিলো যথাক্রমে ৫০ হাজার ১২৫ ও ৫২ হাজার ৪১৮, মাত্র ২ হাজার ২৯৩ ভোটে হেরে যান বিএনপির প্রার্থী।
কিন্তু ২০০১ সাথে আওয়ামীলীগের গডফাদার হিসেবে পরিচিত সেই আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ ও তার সসস্ত্রবাহিনীকে পরাজিত করে ১৪ হাজার ০৩১ ভোট বেশি পেয়ে আওয়ামীলীগের দূর্গে বিএনপির জন্য জয় এনে দেন এই জহিরউদ্দিন স্বপন। তখন তিনি ভোট পান ৮১ হাজার ৭৯১টি ও আবুল হাসানাত পান ৬৭ হাজার ৭৬০ ভোট। এলাকার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আওয়ামীলীগের গডফাদার আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর পালিত সসস্ত্রবাহিনীর সামনে কোনো ধরনের সন্ত্রাসীবাহিনী ছাড়া একমাত্র মানুষের মন জয়ের রাজনৈতিক কৌশলের কারণেই জয়ী হয়েছিলেন, জহিরউদ্দীন স্বপন। এর কারণ জানতে চাইলে আগৈলঝাড়ার সে সময়কার অত্যন্ত প্রত্যন্ত গ্রাম মোল্লাপাড়া গ্রামের বিএনপির এক সমর্থক বলেন, আমার ছোটো বেলায় দেখতাম এই জহিরউদ্দিন স্বপন কোন দল থেকে যেন নির্বাচন করছিলো, কোনো কর্মী ছাড়াও তিনি হেঁটে হেঁটে আমাদের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলেও চলে আসতেন, দোকানে বসতেন, সাধারণ মানুষের সাথে মিশতেন, চা খেতেন। এভাবেই সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন স্বপন। এলাকায় স্বপন ভাই নামেই তিনি সমধিক পরিচিত বলেই জানান গৌরনদী-আগৈলঝাড়াবাসী।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আবারো জহিরউদ্দিন স্বপনকে বাদ দিয়ে হঠাৎ বিএনপির রাজনীতিতে আবির্ভুত হওয়া নেতা ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবাহানকে এই আসন থেকে মনোনয়ন প্রদান করে বিএনপি। সে বার তিনি প্রথমে স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও পরবর্তীতে তিনি দলীয় স্বার্থে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। সেখানেও তিনি তার দূরদৃষ্টির পরিচয় রেখেছিলেন।
এরপর এ দেশে হাসিনার অধীন যত নির্বাচন হয়েছে তার হালহকিকত কারো না জানা নয়। তিনি এর মধ্যে আওয়ামী দুঃশাসনের দ্বারা নানাভাবে নিগৃহীত, নির্যাতিত ও অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। তবুও তিনি এলাকায় এসেছেন, মানুষের খোঁজ-খবর রেখেছেন বলে জানায় গৌরনদী-আগৈলঝাড়া এলাকার মানুষ। তিনি সবসময়ই সবরকম প্রতিকূলতা নিজের প্রজ্ঞা ও মেধার জোরে উতরে গেছেন।
সর্বশেষ, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচনেও তাকে পড়তে হয়েছিলো বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ও সুবিধাভোগী লোভী কিছু ৩য় সারির নেতা-কর্মীর প্রতিরোধের মুখে। অর্থের শক্তিতে প্রভাব বিস্তারকারী বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবহানের অপকৌশল ও বিরোধী প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর প্রতিরোধও তিনি তার রাজনৈতিক মেধার জোরে টপকে যান। তিনি হিন্দু-মুসলিম সকল মানুষকে সমান চোখে বিচার করে এবং তাদের সমান সামাজিক মর্যাদা দিয়ে ভোটারদের মধ্যে আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হন। তাইতো কোনো পেশী শক্তি বা অর্থ শক্তি নয়, মেধার শক্তিতেই তিনি হয়ে ওঠেন গৌরনদী-আগৈলঝাড়ার অপ্রতিরোধ্য। তিনি শত বাধা উপেক্ষা করে এবারের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় লাভ করেন। এবারের নির্বাচনে তিনি ১ লাখ ৫৫২ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা কামরুল ইসলাম খান পান ৪৬ হাজার ২৬৩ ভোট। ৫৪ হাজার ২৮৯ ভোটের ব্যবধানে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
তার এই মেধার প্রতিদান হিসেবেই সবার আগে বাংলাদেশের প্রবক্তা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার মন্ত্রীসভায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিলেন জহির উদ্দিন স্বপনকে। ১৯৯০ সালে সর্বশেষ সুনীল কুমার গুপ্তের পর দীর্ঘ বিরতিতে মন্ত্রী পেলো গৌরনদী-আগৈলঝাড়া আসনের মানুষ। এ জন্য এ এলাকার তথা বরিশাল জেলার মানুষ মনে করছেন, এবারের মন্ত্রীসভায় জহির উদ্দিন স্বপনের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের কারণে উন্নয়নের দিক থেকেও বরিশাল গুরুত্ব পাবে। দায়িত্ব গ্রহণের পর জহির উদ্দিন স্বপনও তেমনটাই ঈঙ্গিত দিলেন। তিনি বলেন, ‘বরিশালবাসীর দীর্ঘদিনের আস্থা ও ভালোবাসার প্রতিদান দিতে চাই। দেশ ও জনগণের স্বার্থকে সর্বাগ্রে রেখে দায়িত্ব পালন করবো। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে এলাকার জনগণের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানাই।’
বর্তমান তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী স্বপনের রাজনৈতিক পদ-পদবি ও দক্ষতাও কোনো অংশই কম ছিলো না। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দলের এবং দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন একাধিকবার। দেখা যায়, জহির উদ্দিন স্বপনের রাজনৈতিক জীবন শুরু ছাত্ররাজনীতি দিয়ে। তিনি খুলনা সরকারি ব্রজলাল কলেজের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। ছাত্রনেতা হিসেবে ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। একইভাবে জাতীয় রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক প্রতিটি সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন জহির উদ্দিন স্বপন। এরপর ১৯৯৩ সালে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধাপে ধাপে দলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপির মিডিয়া সেলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ছিলেন তিনি। এর আগে কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক ও সহকারী দপ্তর সম্পাদক হিসেবেও সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পান জহির উদ্দিন স্বপন। বর্তমানে এই পদেই আছেন।
জহির উদ্দিন স্বপন এর আগে সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় জাতীয় সংসদের বিভিন্ন স্থায়ী কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি এবং সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ুসম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও জহির উদ্দিন স্বপনের সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে। দুবার তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন। এ ছাড়া মানবাধিকার, আইনের শাসন, গণতন্ত্র ও মানব নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করা বিশ্বব্যাপী আইনপ্রণেতাদের নির্দলীয় নেটওয়ার্ক ‘পার্লামেন্টারিয়ানস ফর গ্লোবাল অ্যাকশন (পিজিএ)’-এর এশিয়া অঞ্চলের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই সঙ্গে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক যুব ও ছাত্র সংগঠনের সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি।